অসমাপ্ত ভালবাসা

-- রিয়া !!!
আমার টাই টা খুঁজে পাচ্ছিনা।
-- দাঁড়ান আমি খুঁজে দিচ্ছি।
আজ অফিস যেতে অনেক লেইট
হয়ে যাচ্ছে সাব্বিরের।
খুব তাড়াহুড়া করে বের হতে গিয়ে টাই
পড়তে ভুলে গিয়েছে সে।"
-- এই তো। পেয়েছি দাঁড়ান
আমি পড়িয়ে দিচ্ছি।
এই বলে সাব্বিরের পাশে যেতেই
সে রিয়ার হাত
ধরে ফেলে।
-- না প্রয়োজন নেয়। আমি পড়ে নিব, বাই
টেইক
কেয়ার।


সাব্বির অফিসের কাজে বের হয়ে গেল।
এদিকে রিয়া মুখ নিচু
করে এখনো সাব্বিরের
দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।
একটু একটু ঝাপসা লাগছে সামনের
সিঁড়িটা।
হয়ত নিয়মিত আজও তার চোখের
কোণে পানিগুলো খেলে বেড়াচ্ছে।
পেছনে কারো হাত তার ঘাড়ে অনুভব
করতে পারল
সে।
চমকে গিয়ে চোখের
পানি মুছতে গিয়ে পুরোটা মুছতে সক্ষম
হলনা।
-- বৌমা।
-- হ...হ্যা আম্মা। কিছু বলবেন. ???
-- তোমার চোখে পানি কেন মা ???
কি হয়েছে ???
-- ও কিছুনা। হয়ত পোকা পড়েছে।
-- মা রে....
আমি সব বুঝি.....!!!
তুই আমাকে ক্ষমা করে দিস।
আজ আমার জন্যে তোর এই অবস্থা।
চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন
রিয়ার শাশুড়ি।
-- ছিঃছিঃ মা আপনি এসব
কি বলছেন. ???
-- হুম ঠিকই বলছি।
তবে একটা কথা মাথায় রাখ, এত
তাড়া ভেঙ্গে পরলে চলবেনা।
একটা ছেলেকে মেয়েরাই ভাল হ্যান্ডেল
করতে পারে।
তুই একদম ভেঙ্গে পরবিনা।
আমি আছি তো।
-- অবশ্যই আম্মা।
আপনি দোয়া করবেন, আমার জন্যে।
*****
জানালার পাশে চায়ের কাপ
হাতে বসে আছে রিয়া।
সামনে গল্পের বই।
আর টিভি ও চলছে।
সিরিয়াল দেখার ফাঁকে ফাঁকে হিরু-
হিরুইন এর
রোমাঞ্চ গুলো বেশ ভাল ভাবেই লক্ষ
করছে সে।
মূহুর্তেই মন টা খারাপ হয়ে গেল তার।
কারণ বিয়ে হয়েছে আজ তিন মাস।
সাব্বির
কখনো টিভির ঐ হিরুর
মতো করে রিয়ালে জড়িয়ে ধরেনি।
সাব্বিরের বাবা- মা এবং রিয়ার
বাবা-মা তখন
একই গ্রামে বসবাস করত।
তাদের দুই পরিবারের মধ্যে বেশ ভাল
সম্পর্ক ছিল
বিশেষ করে সাব্বিরের মা আর রিয়ার
মা,
এরা ছিল একে অপরের শুধু বান্ধবী না।
একে বারে বোনের মতো।
সাব্বিরের বাবার চাকরির
সুবাদে সাব্বিরের
পরিবার গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে গেলেও
রিয়ার
পরিবার গ্রামেই থেকে যায়।
আর সাব্বির ভাল পড়ালেখা করার
জন্যে বাইরে চলে যায়।
পড়া শেষ করে বাংলাদেশে আসার পর
থেকেই
তাকে বিয়ের জন্যে চাপ দেওয়া হয়।
রিয়া ছোট বেলা থেকেই বেশ কিউট
এবং সৌন্দর্যের অধিকারী ছিল।
তখন থেকেই রিয়ার মা কে আগে ভাগেই
সাব্বিরের সাথেই ওর বিয়ের
কথা বলে রেখেছিলেন সাব্বিরের মা।
এখন সব কিছু ঠিকই ছিল।
কিন্তু বিদেশ থেকে আসার পর যে ধরনের
মেয়েদের
প্রতি সাব্বির আকৃষ্ট ছিল,
রিয়া সে ধরনের
মেয়ে নয়।
আর এতে সাব্বিরের অমত থাকা সত্বেও
মায়ের
আদেশে তাকে এই বিয়ে করতে হয়।
তাই আজ পর্যন্ত রিয়ার দিকে ভাল
করে ফিরেও
তাকায়না সে।
রিয়া খুব সাদাসিধা একটা গ্রাম্য
মেয়ে।
লেখাপড়াও করেছে ভাল মত।
কিন্তু অন্যদের মত কোন প্রকার
চঞ্চলতা তার
মাঝে উপস্থিত নেয়। যা সাব্বির
সবসময় ওর
মাঝে খুঁজে বেড়ায়।
সাব্বিরের ফ্রেন্ডদের
মতে রিয়া একটা খ্যাত।
ওর মত মেয়ে বিয়ে করা মানে নিজের
জীবন
নিজেই শেষ করে দেওয়া।
ফ্রেন্ডদের সাথে এসব বিষয়
নিয়ে আলোচনা করার সময় রিয়া অনেক
বার
দেখে ফেলেছিল আর আড়ালে কাঁদত।
*****
বিকেল পার হতেই কাজ কর্ম শেষ
করে আবারও
গল্পের বই এর দিকে মন দিল সে।
একটু পর কি মনে করে আলমারিত
দিকে চোখ পরল
তার।
কিছুদিন আগে একটা ছবির এলবাম
দেখেছিল
সে।
সেখানে সাব্বিরের বেশ কিছু ছবি আছে,
যেগুলাতে ওদের ছোট বেলার ছবিও
থাকার
কথা সাথে সাথে চাবিটা নিয়ে আলমারি খোলে ফটোর
এলবাম টা হাতে নিল সে।
সাব্বিরের ছবি গুলো বেশ সুন্দরই
লাগছে।
সব ছবিতে কিউট
একটা হাসি বিদ্যমান।
বিয়ের পর থেকে এই টাইপের
হাসি কখনো দেখেনি সে।
সারাক্ষণ কেমন জানি মুখটা ভার
হয়ে থাকে তার।
এলবাম টা বেশ বড় ছিল।
ছবি গুলা দেখে শেষ হওয়ার পথে, তাই
সেটা ঠিক
স্থানে আবার রেখে দিতে গেলে সেখান
থেকে ছোট
একটা ডায়েরী রিয়ার চোখে পরে।
এলবামটা আলমারি তে রেখে দিয়েই
ডায়েরীটা হাতে নিয়েই
পড়তে থাকে সে।
বেশ পুরানো ডায়েরী,
এটাতে সাব্বিরের অনেক
মনের কথা লিখা আছে।
কিছু ইন্টারেস্টিং লেখাও ছিল।
স্পষ্ট লিখা আছে শান্তা নামক এক
মেয়ের
সাথে সাব্বিরের ভাল রিলেশন ছিল,
পড়ার
উদ্দেশ্যে বাইরে চলে যাওয়ার সময়
সাব্বির
শান্তাকে কথা দিয়েছিল পড়া শেষ
করে এসেই
তাকে তার ঘরের বৌ করে আনবে।
কিন্তু সাব্বির দেশে ফেরার আগেই
শান্তার
বিয়ে হয়ে যায়।
-- আহারে বেচারা, শেষ মেস ছ্যাঁকা !!!
হিহিহি করে হাসতে লাগল রিয়া।
আবারও ডায়েরীর লেখার দিকে মন দিল
সে।
সেখানে রিয়ার আচরণ, কথা বলার ধরন,
সাব্বিরের প্রিয় কালার, ভাল লাগার
মোমেন্ট
এবং কিছু মিষ্টি অনুভূতির
কথা লিখা আছে।
ডায়েরীটা পড়ে শেষ করল রিয়া।
এবং যেখানে পেয়েছিল সেখানেই
রেখে দিয়েছে।
আসলেই তো শান্তার আচরণের
সাথে রিয়ার
আচরণের অনেক পার্থক্য, এসব হয়ত
সাব্বির খুব
মিস করে।
-- না আর মিস করতে দেওয়া যাবেনা।
এই বলে আবারও মুচকি হাসি দিল রিয়া।
আজ সাব্বির বাইরে ডিনার করে আসার
কথা ছিল।
তাই রিয়া অপেক্ষা না করে রাতের
খাবারটা খেয়ে আবার তার রুমে প্রবেশ
করল।
আলমারি খুলে ডায়েরীটা আবার
হাতে নিলা এবং সাব্বিরের পছন্দের
কি কি ছিল সেগুলাতে চোখ
বুলাতে লাগল।
একটু পর আলমারি থেকে নীল
শাড়িটা বের করল
সে।
সাথে কালো টিপ।
চোখে কাজল দিয়ে, হাত ভর্তি কিছু
রঙ্গিন
কিছু চুড়ি পড়ল।
এভাবে ডায়েরী পড়ে একে একে সব কাজ
সম্পন্ন
করল সে।
আর ডায়েরীতা লিখা ছিল
শান্তা ইচ্ছা করেই
কপালের টিপ টা বাঁকা করে দিত, আর
সাব্বির
সেটা ঠিক করে দিত।
রিয়াও তার ব্যতিক্রম কিছু করলনা।
ইচ্ছা করেই সব ঠিক করলেও টিপ
টা বাঁকা করেই
দিল।
একটু পর কলিং বেলের আওয়াজ
পেয়ে দরজার
দিকে ছুটে যায় সে।
দরজা খুলতেই সাব্বিরের চেহারার
দিকে চোখ
পরে রিয়ার।
সে হা করে আছে, কেমন
জানি বাচ্চা বাচ্চা একটা ভাব
এসেছে তার
চেহারায়।
আজ বরং তাকেই বোকা এবং খ্যাত
মার্কা মনে হচ্ছে।
অবশ্য সাব্বিরের এই বৈশিষ্ট্যের
কথা ডায়েরীতে পড়েনি রিয়া।
অনেক কষ্টে নিজের
হাসি লুকালো রিয়া।
-- হা করে কি দেখেন. ???
ভেতরে আসবেন না ??
নাকি আমাকে দেখে পেত্নী মনে করে ভয়ে পালানোর
চিন্তা করছেন?
এক নিশ্বাসে কথা গুলো বলে ফেলল
রিয়া।
-- ওহ... হ্যা তাই তো।
*****
রুমের জানালা টা খোলা।
রিয়া খাটের এক পাশে বসে আছে।
জানার ফাঁক দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদের
আলো সোজা তার চেহারায় এসে পড়েছে।
এই সময়টাই সাব্বির প্রতিদিন ল্যাপটপ
নিয়ে অফিসের কিছু কাজ করে থাকে।
রিয়া কে একটুও সময় দিতনা।
সাব্বিরের এরূপ আচরণ দেখে অন্য
দিকে ফিরে রিয়া মুচকি হাসছে......
নীরবতা ভেঙ্গে রিয়া বলে উঠল,
-- চাঁদে যাবেন. ???
-- হ্যা, চলো। আকাশে পূর্ণিমার
চাঁদটা আজ একটু
স্পেশাল মনে হচ্ছে আমার কাছে।
সেট উপভোগ করা প্রয়োজন।
-- আচ্ছা ঠিকাছে, দাড়ান
আমি চা নিয়ে আসি।
চা খেতে খেতে আড্ডা দিব ছাদে।
*****
চায়ের কাপে এক চুমক দিয়ে আকাশের
দিকে তাকালো সাব্বির।
আরেকবার রিয়ার দিকে তাকালো।
মৃদু বাতাসে রিয়ার সিল্কি চুল
উড়ে বেড়াচ্ছে।
সাব্বিরের খুব ইচ্ছা হচ্ছে রিয়ার
সাথে একটু
গা ঘেঁষে দাঁড়াতে।
কিন্তু কোথায় যেন বাঁধা পাচ্ছে সে।
কেন যে এতদিন খারাপ আচরণ করেছিল
তার
সাথে !!
আজ রিয়ার চেহেরা থেকে চোখ
সরছেনা তার।
চেহারায় বেশ মায়া, চোখ
গুলো টানাটানা এ যেন
মানুষ রূপি কোন পরী তার
সামনে দাড়িয়ে আছে।
সাব্বিরের এমন
বোকা বোকা চেহারা আগে কখনো লক্ষ
করেনি রিয়া।
আজ আড়চোখে তার দিকে তাকাচ্ছে আর
হাসছে সে।
একটু পর নীরবতা ভেঙ্গে সাব্বির
বলে উঠল।
-- আচ্ছা, কখনো কি এমন কথা ছিল
যে চাঁদ
একসাথে দুইটা দেখা যাবে ???
-- না তো। আমি তো এই টাইপের
কথা কখনো শুনিনাই।
হঠাৎ এ কথা কেন বলছেন. ??
অবাক হয়ে বলতে থাকে রিয়া।
-- না মানে আজ দুইটা চাঁদ এক
সাথে দেখার
সৌভাগ্য হয়েছে আমার।
-- কোথায় দেখি ???
-- হুম দেখাব যদি কাছে আসো ।
সাব্বিরের কথা শুনে রিয়া লজ্জাই লাল
হয়ে যায়।
আর এখনো আগের জায়গায় দাড়িয়ে আছে।
তার এই অবস্থা দেখে সাব্বির নিজেই
এগিয়ে যায়।
আর রিয়ার গালে হাত রেখে বলে এই
তো....!!!
একটা চাঁদ আকাশে। আরেকটা চাঁদ আমার
সামনেই।
যাকে ধরার সৌভাগ্য হয়েছে আমার।
যা আগে কাছে থাকার পর ও দেখার
জন্যে ঐ
মেগাফিক্সেল এর চোখ ছিল না।
রিয়া চুপচাপ সাব্বিরের
কথা শুনে যাচ্ছে।

অসমাপ্ত ভালবাসা

মুখ দিয়ে কিছু বের হয়েও কেন
জানি আটকে যাচ্ছে।
-- একি সব কিছু ঠিক মত করে। টিপ
টা ঠিক
করে দিতে পারলেনা ???
দাঁড়াও আমি ঠিক করে দিচ্ছি......
আহ...
প্রিয়জনের প্রথম স্পর্শ. !!!
সত্যিই উপভোগ করার মত।
ভালবাসার পূর্ণতা পাওয়া যায় এমন
মানুষকে কাছে পেলেই।
যাকে আমরা সর্বদা কল্পনার
রাজ্যে সাজিয়ে থাকি।

দুদিন পরে ফোন দিল কেন ও?

এক 'তোকে একটা জরুরী কথা বলার ছিল।'
'কী কথা? সামনাসামনি বলিস।
জরুরী কথা ফোনে কেন?'
'কথাটা আসলে তোর
সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারব
না। তাই ফোনেই বলতে চাচ্ছি।'
'ঠিক আছে বল।' 'কিভাবে বলব বুঝতে পারছি না।
তুই রাগ
করবি নাতো?'

 
valobashar lal golap

'কথাটা এখনও শুনলামই না! আগে বল?'
'তোকে না আমার অনেক পছন্দ। আই লাভ ইউ।'
হুট করে কথা বলে ফেলল সাজেদ।ওপাশ
থেকে কোনো রেসপন্স আসছে না!
কিছুক্ষণ পর নিরবতা ভেঙ্গে আওয়াজ আসল,
'বন্ধুত্বটা এভাবে নষ্ট করে দিলি?!'
সাজেদ কিছু বলতে যাবে, এর আগেই
ফোনের
লাইনটা টুট টুট করে কেটে গেল।
ও চিন্তায় পড়ে গেল। কাজটা কি ঠিক করেছে?
এতদিনের বন্ধুত্বটা কি আসলেই নষ্ট
হয়ে যাবে? একবার ফোন
করে সরি বলে নেয়া দরকার। নাহ্!
এখন ফোন দেয়া চলবে না। আবার
যদি বেঁকে বসে? নিজেকে কেমন নিচু
প্রকৃতির
মানুষ মনে হচ্ছে। প্যাকেট থেকে একট
সিগারেট
বের করে ঠোঁটে নিল। তারপর 
দিয়াশিলাইয়ের
সাহায্যে সিগারেটটা ধরিয়ে কুন্ডলী 
পাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে লাগল।
******
সাজেদ ও তিন্নি একটা প্রাইভেট
ভার্সিটি থেকে বিবিএ করছে। ওদের পাঁচ
নাম্বার সেমিস্টার চলছে। বন্ধুত্বটা তিন
নাম্বার সেমিস্টারে উঠার পর হয়েছে।
বন্ধুত্বের গাঢ়তা আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে।
সবসময় একে অন্যের খুঁজ- খবর নেয়। কিন্তু
সাজেদ
তিন্নির যতই কাছে আসছিল, ততই তিন্নির
প্রতি ওর দূর্বলতা বাড়ছিল।
যাকে ভালবাসা নামে আখ্যায়িত করা যায়। এর
ফলস্রুতিতে আজ বলে দিয়েছে মনের কথা।
কিন্তু হিতে বিপরীত হয়ে গেছে এখন। বন্ধুত্ব
টিকবে কি না- এই চিন্তা সাজেদের মনে,
ভালবাসার কথা তো ভুলেই গেছে। দুই দুদিন গত
হয়ে গেছে, তিন্নির সাথে সাজেদের
যোগাযোগ নেই। সেই সাথে ভার্সিটিও বন্ধ,
দেখা হওয়ার চান্স নেই।
সাজেদ বারান্দায় একা বসে আছে। পুরো এক
প্যাকেট সিগারেট কখন শেষ
হয়ে গেছে বুঝতেই
পারেনি। একটু আগে ফোন দিয়েছে এক
বন্ধুকে মদ জোগাড় করার জন্য। এমন
পরিস্থিতিতে মদই
কাছের বন্ধু। সিগারেটও অবশ্য।
রেডি হয়ে রুম থেকে বের হবে- তখনই
মোবাইল
ফোনটা বেজে উঠল। স্কিনে তিন্নির
নামটা জ্বলজ্বল করছে। নামটা চোখে পড়তেই

ভুত দেখার মত চমকে উঠল! কী করবে মাথায়
আসছে না। দুদিন পরে ফোন দিল কেন ও?
কী বলবে এখন ফোন ধরার পর? এসব
ভাবতে ভাবতে ফোনের লাইন কেটে গেল।
আবার
রিং বেজে ওঠল। এবার ও সাত-পাঁচ না ভেবেই
সাথে সাথে রিসিভ করল। তারপর
কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল, 'হ্যালো!' 'কী মিস্টার,
বিজি নাকি?'
'না..মানে..'
'দুদিন হয়ে গেল একটা ফোন দিলেন না?
আমি তো আপনার ফোনের অপেক্ষায় ছিলাম।'
সাজেদ ওর কথার মাহাত্ম্য বুঝতে পারছে না।
যে মেয়ে দুদিন আগে ওর সাথে রাগ
করে ফোন রেখে দিয়েছিল, ও আজ নিজেই
ফোন করে এমন
কথা বলছে কেন?
আসলে মেয়ে জাতিকে বোঝা সবচেয়ে দূরহ
কাজ!
সাগর তলায় স্বরূপে মুক্তো খুঁজার মত। 'কী হল
চুপ করে আছিস যে?'
তিন্নি এবার গলায় যতেষ্ট গম্ভীর ভাব
এনে বলল।
'না, কিছু না।'
'তুই সেদিন হুট করে কথাটা বলে ফেললি, আমার
খুব রাগ হয়েছিল, জানিস? যাকে এতদিন বন্ধু
হিসেবে ভেবে এসেছি সে কি না আমাকে...'
'এখন কি বন্ধুত্বটাও নষ্ট হয়ে যাবে?'
'হুম..সব নষ্ট হয়ে যাবে যদি সেদিনের
কথাটা আবার না বলিস।' হি হি করে হেসে উঠল
তিন্নি।
সাজেদ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস
করতে পারছে না। কী বলছে তিন্নি এসব?
'সত্যি বলছিস? নাকি মজা নিচ্ছিস?'
'সত্যি বলতে কী আমি প্রথমে রাগ করেছিলাম
অনেক। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে অনুভব করলাম
আমিও
তোর প্রতি দূর্বল হয়ে গেছি। গত রাত
গুলোতে ঠিকমত ঘুমাতে পারিনি। সাজেদ, আই
অলসো লাভ ইউ! ' সাজেদের
সারা শরীরে আনন্দের শিহরণ
বইতে লাগল! ওর এখন টাট্টুঘোড়ার
মতো লাফাতে ইচ্ছে করছে। তারপর উচ্ছাসিত
কণ্ঠে বলল,
'তিন্নি, তোকে অসংখ্য ধন্যবাদ! এখন রাখি,
আমি আবেগ ধরে রাখতে পারছি না।
পরে কথা বলি?'
'পাগল একটা! ওকে, বাই!' ফোন কেটে দিতেই
দেখল ওর সেই বন্ধুটার
অনেকগুলো মিসকল। সাথে সাথে ফোন ব্যাক
করল।
' কিরে, এতোক্ষণ ধরে তোর ফোন
ওয়েটিং!
আমি সেই কখন থেকে নদীর
পাড়ে বসে আছি।'
ওপাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠল ওর বন্ধুটা।
'আরে দুস্ত, একটা সুখের সংবাদ আছি।'
'কী সুখের সংবাদ?
ভাবী কি রাজি হয়ে গেছে নাকি?'
'হ রে দুস্ত, ঠিকই ধরছিস।'
'তাইলে মদ খাবি না?'
'খাব না মানে? আজ এই খুশিতে পার্টি হবে।
আমি আসছি এক্ষুনি।' 'ঠিক আছে আয়।' তিন
ইদানিং ভার্সিটির বন্ধুরা সাজেদ ও তিন্নির
মাঝে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ করছে। যেই
ছেলে এতদিন পিছনে বসে ক্লাস করেছে,
সে কি না এখন সামনের সারিতে মেয়েদের
পাশে বসে। আরো অবাক করার বিষয়, ও ক্লাস
শুরু
হবার আগে আজ স্যার যা পড়াবে সে বিষয়
ঘেটে দেখে। আর তিন্নি? যে মেয়ে ক্লাস
শেষ
হবার পর এক মিনিটও
ভার্সিটিতে না থেকে বাসায় চলে যেত
সে কি না এখন ক্লাস শেষে বন্ধুদের
সাথে আড্ডা দেয়,
প্রোগ্রামগুলোতে এটেন্ড করে।
তাছাড়া আরেকটা বিষয় লক্ষনীয়, সাজেদ কদিন
যাবত সিগারেট খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে।
মদতো স্পর্শই করে না। মাঝেমধ্যে নামাজেও
যেতে দেখা যায়।
তিন্নির আদেশ, আর যাই করুক, ঠিকমত নামাজ
পড়তে হবে, আর মদ স্পর্শ করা যাবে না।
সাজেদও ওর কথা মেনে চলার জোর
চেষ্টা করছে। ভালবাসা বেশিদিন গোপন
থাকে না।
সে হিসেবে বন্ধুবান্ধবদের না জানালেও
একসময় ওরা জেনে গেল ওদের সম্পর্কের
কথা।
তবে সবাই খুশিই হয়েছে এতে।
দিনগুলো ভালই যাচ্ছিল। কিন্তু কে জানত
সামনে এমন কষ্টের দিন আসবে, যার
কথা তিন্নি ব্যতীত অন্য কেউ কল্পনাও করেনি।
চার ফাগুনের সকাল। কী মনোরম প্রতিবেশ।
সাথে শরীর জুড়িয়ে দেয়া ঠান্ডা হাওয়া বইছে।
সাজেদ বারান্দায় কফির মগ হাতে বসে আছে,
আর
থেমে থেমে তাতে চুমুক দিচ্ছে। এখন
একটা সিগারেট থাকলে খুব জমত। কিন্তু ও
সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। ভালই
হয়েছে। ক্ষতিকর বস্তু স্পর্শ না করাই শ্রেয়।
এসব ভাবছে এমন সময় মোবাইলে রিং আসল।
তিন্নির কল। রিসিভ করে বলল,
'কী খবর টুনটুনি পাখি?'
'খবর ভাল না।'
'কী হয়েছে?' 'বাসা থেকে বিয়ের
কথা চলছে।'
'এটাই তো স্বাভাবিক। মেয়ে বড় হয়েছে,
বিয়ের
কথাতো উঠবেই। বাসায় আমাদের সম্পর্কের
কথা বলে দে।'
'তা বলা যেত। কিন্তু..'
'কিন্তু কী?' 'তোকে আগেই বলা দরকার ছিল।
কিন্তু তুই কষ্ট
পাবি বলে বলিনি।'
'কী এমন কথা?'
'ফোনে বলতে ইচ্ছে করছে না। লেক
পাড়ে আয়,
সেখানে বলব।'
'ঠিক আছে, আসছি।' বলে সাজেদ
ফোনটা রেখে দিল।
'কী এমন কথা হতে পারে যা শুনলে আমি কষ্ট
পাব?' নিজের মনকে প্রশ্ন করল সাজেদ। কিছুই
বোঝে উঠতে পারছে না। জানার জন্য
মনটা খচখচ করছে। এখন একটা সিগারেট
খাওয়া খুব জরুরী হয়ে পড়েছে।
নিচে গিয়ে কি সিগারেট খাবে?
পরক্ষণে মনে হল তিন্নির
সাথে তো দেখা করতে যেতে হবে।
তাড়াতাড়ি গোসল সেরে রেডি হয়ে বাইকটা বের
করলো। মা বললেন,
'কিরে নাস্তা করবি না?' 'না মা, বাইরে করব।' পাঁচ
পাশাপাশি দুজন বসে আছে লেকের পাশে এক
বেঞ্চে। দুজনই নিশ্চুপ। সাজেদ
তো প্রতিবন্ধিদের মত একদৃষ্টিতে সামনের
দিকে তাকিয়ে আছে। একটু
আগে তিন্নি যা শুনিয়েছে, এমনটা হওয়ারই
কথা। ওকে যে এখনো হাসপাতালে নিতে হয়নি,
এজন্য শুকরিয়া। কিছুক্ষণ আগে সাজেদ তিন্নির কাছ
থেকে জেনেছে, তিন্নির যার সাথে বিয়ের
কথা চলছে তার সাথে আরও অনেক আগেই ওর
কাবিন হয়ে আছে। সময় হিসেব করলে, ওদের
সম্পর্ক গড়ারও এক বছর আগে।
ওকে তিন্নি জানায়নি কষ্ট পাবে বলে। এখন
কি কষ্ট পাচ্ছে না? বরং তখন হয়ত
ভুলে যেতে পারত। এখন কি পারবে?
পারবে কি ভুলে যেতে এতদিনের ভালবাসার
স্মৃতি? জানে ও, পারবে না। বুকের
ভেতরটা এখনই চৌচির হয়ে যাচ্ছে।
পা থেকে মাটি খসে যাচ্ছে। পৃথিবীটা চরকির
মতো ঘুরছে। 'আই এম রিয়েলি স্যরি!'
সাজেদের হাতে হাত
রেখে বলল তিন্নি।
তিন্নির কথায় হুশ ফিরল সাজেদের।
'আচ্ছা, এখন উঠা দরকার। বাসায় যেতে হবে।'
বলে ও উঠে দাঁড়াল। তারপর
বাইকে চেপে বসল।
ঘাড়ে নরম হাতের আলতো ছোঁয়া পেল।
তিন্নি বাইকের পিছনে বসে ওর
ঘাড়ে আলতো করে হাত রেখেছে। সাজেদ
এত
কষ্টের মাঝেও মুচকি হেসে বাইকটা স্টার্ট
দিল। ছয় আজ তিন্নির বিয়ে। খানিক আগে ওর
সাথে কথা হয়েছে সাজেদের। বিয়েতে কিন্তু
আসতে হবে অবশ্যই, বলেছে তিন্নি।
ফাগুনের মাতাল হাওয়া চারদিকে বইছে। সেই
হাওয়ার দোল নিশ্চয় তিন্নির মনেও লেগেছে।
আজ তো ওর একসাথে দুই ফাগুন। কিন্তু
সাজেদের জন্য এটা চৈত্র মাস। এই মাসে যেমন
রোদে পুড়ে সব চৌচির হয়ে যায় ঠিক তেমনি ওর
মনটা ফেটে চৌচির হয়ে আছে। ওর
সামনে তিন্নির বিয়ের কার্ড। অবশ্য আরও কিছু
জিনিস আছে। একটা হান্ড্রেড পিপারস, গ্লাস
ভর্তি মদ, একটা পানির বোতল, পটেটো, এক
প্যাকেট সিগারেট ও একটা দিয়াশলাই।
যেই মেয়ের জন্য এসব ছেড়েছিল, ঠিক ওর
কারণেই আবার সেগুলোতে হাত দিয়েছে।
জগতের
নিয়ম কতই না অদ্ভুত। সাজেদ গ্লাসে চুমুক দিল।
চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে।
খুব বেশি কষ্ট না পেলে ছেলেরা কাঁদে না।
ওর
মনে আজ ভীষণ কষ্ট। তিন্নির
বিয়েটা তাহলে হয়েই যাচ্ছে? ও কিছুই
করতে পারছে না? কী করে পারবে!
বিয়ে তো অনেক আগেই হয়ে গেছে।
এখন যা হচ্ছে তা তো ফর্মালিটি। ও এত নিচু হয় নাই
যে অন্যের বউকে নিয়ে পালাবে। ও! বিয়ের
তো সময় হয়ে যাচ্ছে। তিন্নি যাওয়ার
জন্য অনেক করে বলেছে।
যেতে তো হবেই। ওর
কথা তো আর ফেলে দেয়া যায় না। সাত বিয়ের
কয়েকদিন পর।
তিন্নির কল আসল। সাজেদ তখন ঘুমাচ্ছে।
আজকাল
রাত জাগার অভ্যাস হয়ে গেছে। তাই সকাল
দশটায়ও ঘুম ভাঙেনি।
ফোনটা রিসিভ করে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,
'হ্যালো?' 'এখনও ঘুমাচ্ছিস?'
'কী করব বল, রাতে ঘুম হয় না!'
'আই অ্যাম স্যরি। শশুরবাড়ি থাকার
কারণে তোকে ফোন দিতে পারিনি। কাল
রাতে বাসায় আসছি।'
'সমস্যা নাই, ফোন দিলেই কী, না দিলেই কী!
এখন তো তুই আরেকজনের।'
'এমন করে বলছিস কেনও? দেখ, আমার
কোনও
উপায় ছিল না। তুই তো জানিসই।'
'হুম..'
'শোন, আমি তোর কাছাকাছি যতদিন আছি শুধু
তোরই থাকব।'
কথাটা শুনে শোয়া থেকে বসে পড়ল সাজেদ।
কী পাগলের মতো বকছে মেয়েটা! ও
তো ভেবেছিল
সম্পর্কটা এখানেই শেষ করে দেবে। বন্ধু
হয়ে থাকবে বাকি জীবন। পরকীয়ার মত জঘন্য
কাজে লিপ্ত হবে ও? ' কী রে, চুপ কেন?
আমার সাথে সম্পর্ক
রাখবি না?'
'অবশ্যই!' সাজেদের মুখ ফসকে শব্দটা কেন
জানি বেরিয়ে গেল।'
'ঠিক আছে এখন রাখি। আজ ক্লাসে আসব।
দেখা হবে।' 'ওকে বাই।'
'ওকে বাই! লাভ ইউ! উম্মাআ...' এরকম অবাক আর
কখনও হয়নি সাজেদ। মেয়েটার
মধ্যে কোনও পরিবর্তন নেই? যেন কিছুই
হয়নি।
খুব স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলছে ও!
মেয়েরা কি এমনই হয়? কিভাবে পারে ওরা! আট
তিন্নি ভার্সিটিতে এখন রেগুলারই আসে।
সাজেদের সাথে সম্পর্কটা ঠিক আগের মতই
আছে!
সাজেদ সম্পর্কটা রাখতে চায়নি। কিন্তু
তিন্নির আবেগাপ্লুত কথা ওকে কাবু
করে ফেলেছে। সারাক্ষণই ওর পিছনে ঘুরঘুর
করে। তবে আগের চেয়ে মদ খাওয়ার পরিমাণ
বেড়ে গেছে। এখন প্রত্যেকদিনই খায়।
তিন্নি অবশ্য এখন আর এই নিয়ে তেমন কিছু
বলে না। ও শুধু চায় সাজেদের সাথে কিছুটা সময়
কাটাতে। আর কিছুই না।
******
আজ তিন্নি সাজেদকে ফোন দিয়ে বলেছে,
ওদের বাসায় যাওয়ার জন্য। বাসায় কেউ নেই। ওর
নাকি একা একা ভাল লাগছে না।
সাজেদ বাইকটা বের করে ওদের বাসার
উদ্দেশ্য
রওনা হল।
কলিং বেল চাপতেই দরজা খুলে গেল। দরজার
ওপাশে দাঁড়িয়ে তিন্নি। ওর মুখে কেমন রহস্যময়
হাসি লেগে আছে। সাথে এক রাশ মাদকতা।
'ভিতরে আয়।' মিস্টি হাসি দিয়ে বলল তিন্নি।
সাজেদ ভিতরে প্রবেশ করল।
'তুই বস, আমি তোর জন্য চা বানিয়ে আনছি।'
বলে তিন্নি কিচেনের দিকে চলে গেল।
তিন্নিকে আজ অন্যরকম সুন্দর লাগছে। নীল
শাড়ি পরেছে ও। চুলগুলো ছেড়ে দেয়া। চুল
থেকে এখনো টিপটিপ করে পানি পড়ছে।
মনে হচ্ছে মাত্রই গোসল সেরেছে।
তিন্নি চা নিয়ে চলে এলো। সাজেদ চুপচাপ
বসে আছে। এ দেখে তিন্নি বলল,
'কিরে তোর মধ্যে কোন বিকার
দেখছি না যে?
প্রেমিকাকে একা পেয়েও চুপচাপ বসে আছিস?'
ইদানিং সাজেদ তিন্নির কথাগুলো ঠিকঠাক হজম
করতে পারছে না। মেয়েটার পরিবর্তন
চোখে পড়ার মত।
'না, কিছু না। বস।'
তিন্নি সাজেদের পাশে বসল। তারপর বলল,
'আমাকে আজ কেমন লাগছে বললি না যে?'
'একদম হুরের মত!'
'এই হুরকে একান্ত
কাছে পেতে ইচ্ছে করছে না তোর?' গলায়
আবেদন
ঢেলে বলল তিন্নি।
সাজেদ ওর চোখের দিকে তাকাল।
চোখদুটোতে মাদকতায় ভরপুর। ওর মাথা ঝিমঝিম
করছে। নিজের ওপর কন্ট্রোল
হারিয়ে ফেলছে ও।
এগিয়ে আসল তিন্নির দিকে। তিন্নিও এগুতে লাগল
ওর দিকে। একদম কাছাকাছি।
পরস্পরের ঠোঁটের স্পর্শে কেঁপে উঠল
দুজন।
তারপর মেতে উঠল আদিম খেলায়!
পরিশিষ্টঃ সাজেদ এক হাতে মদের বোতল,
আরেক
হাতে মাথাটা চেপে ধরে আছে।
কী করেছে ও
আজ? এত জঘন্যতম কাজ ওর দ্বারা হয়েছে,
বিশ্বাসই করতে পারছে না! মদের বোতল
মুখের
কাছে নিয়ে ভাবল, এটাও কি ও ঠিক করছে?
এটা খাওয়াও তো পাপ। কী করবে এখন
বুঝতে পারছে না। দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেল।
আজ

Follow by Email